ইয়াবার ক্ষতি ও প্রতিকার

দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা সেবনে শারীরিক এবং মানসিক বিভিন্ন মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি হয়। এই নেশার মরন সবলে মানুষের জীবন নিঃশেষ হয়ে যায়। যারা কৌতুহল বসত ইয়াবা সেবনের দিকে ঝুকছেন কিংবা ইতোমধ্যে ইয়াবা সেবন করা শুরু করে দিয়েছেন আজকের আর্টিকেলটি তাদের জন্য। ইয়াবার ক্ষতি ও  প্রতিকার দিকগুলো নিয়ে আজকের এই আর্টিকেলে আলোচনা করা হবে।

Image

ইয়াবা একটি মারাত্মক জীবননাশকারী ড্রাগ যেটি সেবন করলে মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে যায় মানুষ পশুর মতো আচরণ করতে থাকে। তবে ইচ্ছা করলে এই নেশা থেকে দূরে থাকা যায়। আসক্তরাও চাইলে সঠিক চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ জীবন লাভ করতে পারেন। তাই ইয়াবার ক্ষতি ও প্রতিকার জানার জন্য আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন।

কিভাবে ইয়াবার সৃষ্টি হলো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর সৈন্যদের সজাগ রাখতে এবং দীর্ঘ সময় যুদ্ধ করতে অ্যামফেটামিনের ব্যবহার শুরু করেন হিটলার। হিটলারের নির্দেশে তখন রসায়নবিদরা যে ড্রাগ তৈরি করেন তার নাম ছিল “পারভিটিন”। তবে রূপ বদলে এশিয়ায় ইয়াবার প্রবর্তন করে জার্মানি। তবে শোনা যায় যে, কোন গাড়ি সহজে টানতে চাইতো না জন্য ঘোড়াকে পাগল করে দিতে মিয়ানমারের শান প্রদেশে বার্মিজরা এই ড্রাগ তৈরি করে ঘোড়াকে খাওয়াতো।

পরে প্রচন্ড কায়িক শ্রমে জড়িত মানুষরাও এই ট্যাবলেট খাওয়া শুরু করে। এভাবে পর্যায়ক্রমে এটি থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের যৌনকর্মীরা সেবন করতে শুরু করে। আর এভাবেই বিভিন্ন পরিবর্তন এবং পরিবর্ধনের মাধ্যমে ইয়াবার সৃষ্টি হয়ে যায়।

ইয়াবার প্রতি আকর্ষণের কারণ কি?

তরুণ তরুণীদের কাছে এই নিষিদ্ধ ড্রাগসটি ব্যাপক জনপ্রিয়। এটির মূল উপাদানের সাথে মেশানো হয় আঙ্গুর, কমলা বা ভ্যানিলার ফ্লেভার কিংবা বিভিন্ন রকম ফুড কালার ব্যবহার করে লাল কিনবা সবুজ রঙের করা হয়। ইয়াবা নামের ছোট্ট এই ট্যাবলেটটি দেখতে অনেকটা ক্যান্ডির মতো এবং এর সাদও তেমনি। ফলে আসক্ত ব্যক্তিরা এর প্রচন্ড ক্ষতিকর প্রভাবটুকু প্রথমে বুঝতে পারে না। আবার এটি দেখতে ক্যান্ডির মতো হওয়ায় পরিবহন করা বা লুকিয়ে রাখা অনেকটাই সহজ।

অধিকাংশ মাদকসেবী ট্যাবলেট কি মুখেই গ্রহণ করে।

ইয়াবার ক্ষতি

ইয়াবার মত মারাত্মক ক্ষতি কারক মাদক দীর্ঘদিন গ্রহণ করার কারণে দ্রুত গতিতে মানুষের জীবনধারার পরিবর্তন ঘটে। অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়াও এই আসক্তির কারণে শারীরিক ও মানসিক দুই ধরনের মারাত্মক ক্ষতি হয়।

শারীরিক সমস্যা

যৌন চাহিদার পরিবর্তনঃ প্রচন্ড যৌন উত্তেজক ক্ষমতা রয়েছে বলে অনেকেই ইয়াবা ব্যবহার করে। আসক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে এটি ছেড়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন ইয়াবা ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগেনা। শুরুর দিকে কম ডোজে এই ট্যাবলেট কাজ করলেও ধীরে ধীরে ডোজ বাড়াতে হয়। ইয়াবা গ্রহণের শুরুর দিকে সাময়িক যৌন উত্তেজনা বাড়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে যৌন ক্ষমতা লোক পায় বা একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ব্যবহার ফলে শুক্রাণু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতাও লোপ পায়। নারীদেরও ঋতুস্রাবের সমস্যা হয় এবং ক্রমান্বয়ে তাদের যৌন চাহিদা এবং ক্ষমতা কমতে থাকে।

আরো পড়ুনঃ কিডনি ভালো রাখার উপায় কি-কিডনি ভালো রাখার দোয়া

মেথঅ্যামফেটামিন  ও ক্যাফেইন দুটি মস্তিষ্কের উত্তেজক পদার্থ, যা সেবনকারীকে বেপরোয়া করে দেয়। ইয়াবা সেবনে মস্তিষ্কের কিছু ছোট রক্তনালী নষ্ট হতে পারে। দীর্ঘদিন সেবনে অল্প বয়সেও ব্রেন স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হওয়া বা চলাচলে অক্ষম হওয়ার আশঙ্কা ৯৫ শতাংশ বেড়ে যায়।

রক্তচাপ বেড়ে যায়ঃ দ্রুত হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং রক্তচাপ জাগিয়ে তোলে।

মাথা ব্যথাঃ তীব্র মাথাব্যথা হয় বা মাথা ধরে।

দৃষ্টিশক্তি কমে যায়ঃ চোখের মনি প্রসারিত (ডায়ালাইটেড) হয়। দৃষ্টিশক্তি আস্তে আস্তে কমে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়।

স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ঃ কোন কিছু মনে রাখতে পারে না বা ভুলে যায়। কাজের প্রতি মনোযোগ থাকে না বা আগ্রহ হারিয়ে যায়।

ক্ষুধা নষ্টঃ ইয়াবার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হলো ক্ষুধা কমে যাওয়া বা খুদা হীনতা। হলে আস্তে আস্তে ওজন কমে যায়।

বুক ধরফরঃ মাঝেমধ্যেই বুক ধরফর করে, অস্থিরতায় ভোগে। বুকে ব্যথা বা হার্টের সমস্যা হয়।

লিভার সমস্যাঃ লিভার সিরোসিস থেকে লিভার ক্যান্সারেও পরিণত হতে পারে।

কিডনির সমস্যাঃ ইয়াবা সেবনে শরীরে এক ধরনের তাপ তৈরি হয়, যা কিডনির ক্ষতি করতে পারে।

ফুসফুসের সমস্যাঃ ইয়াবা নাক দিয়ে ধোঁয়া হিসেবে ব্যবহার করায় ফুসফুসে পানি জমা বা অন্য ক্ষতি হতে পারে।

চর্মরোগঃ স্ক্রিন বা চামড়া লাল হয়ে যায় বা মারাত্মক চর্ম রোগের সমস্যা তৈরি করে।

কর্মক্ষমতা হারাইঃ শরীর প্রচন্ড অলস হয়ে পড়ে। পড়াশোনা, দৈনন্দিন কাজকর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং সকল কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

হাইপারথার্মিয়াঃ অতিরিক্ত ইয়াবা গ্রহণ হাইপারথার্মিয়া বা উচ্চ শারীরিক তাপমাত্রার কারণ হতে পারে।

ঘুমের সমস্যাঃ ইয়াবার প্রভাবে কেউ দিনে ঘুমায়, রাতে জেগে থাকে। আবার কেউ একটানা সাত থেকে ১০ দিন জেগে থাকে, আবার একটানা ঘুমায়।

এছাড়া পেটে ব্যথা, দাঁত কালো হওয়া, বমি হওয়া বা বমি বমি ভাব হওয়া, খিচুনি এবং খিচুনি থেকে মৃত্যুও হতে পারে।

মানসিক সমস্যা

ব্যবহার পরিবর্তন বা মেজাজ বিগড়ে যাওয়াঃ ইয়াবা আসক্তির ফলে ব্যক্তির ব্যবহারে আমূল পরিবর্তন ঘটে। মেজাজ বেশ খিটখিটে হয়। আচারণ হয় নিষ্ঠুর, নির্মম ও হিংস্র ধরনের। অল্পতেই অতিরিক্ত রেগে যায়। বিনা কারণে বেশি কথা বলা শুরু করে। অর্থের জন্য মিথ্যা কথা বলা এমনকি চুরি করাও শুরু করে।

একাকিত্বে ভোগাঃ সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট হয়। সে সর্বদা মানুষের কাছ থেকে এমন কি অভিভাবকের কাছ থেকেও দূরে থাকার চেষ্টা করে। একেবারে চুপচাপ স্বভাবের হয়ে যায়।

আরো পড়ুনঃ ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও চিকিৎসা

নেশায় বুঁদ হওয়াঃ কখন আবার ইয়াবা নেবে, সে চিন্তায় ঘুরপাক খায়, বোধ হয়ে থাকে।

আত্মহত্যার প্রবণতাঃ ডিপ্রেশন বা হতাশা জনিত নানা রকম অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে। অনেকে হঠাৎ আত্মহত্যা করে বসে।

চিকিৎসা

ইয়াবা আসক্তদের চিকিৎসা কয়েকধাপে করা হয়। প্রথম ধাপ হল ডিটিক্সিফিকেশন প্রসেস। এর জন্য রোগীকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করাতে হয়। সেখানে ইয়াবা গ্রহণ থেকে ব্যক্তিটিকে বিরত রেখে শরীর নেশা মুক্ত করা হয়। তখন তার উইথড্রল ইফেক্ট হয়। অর্থাৎ ইয়াবা না পাওয়ার কারণে শারীরিক ও মানসিক কিছু অসুবিধার সৃষ্টি হয়। অবশ্যই এই ইফেক্টগুলো ৭২ বা ৯৬ ঘন্টা পর আর থাকে না। সমস্যাগুলো কতটুকু জটিল হবে তা নির্ভর করে আগে ইয়াবা গ্রহণের মাত্রা এবং পদ্ধতি ওপর।

⇨ এক থেকে দুই সপ্তাহ পর শারীরিক এবং মানসিক প্রতিক্রিয়া দূর হয়। কিন্তু ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত কোনো নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হয়ে থাকা ভালো। তাছাড়া আবারো ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা জেগে যায়।

⇨ ইয়াবা আসক্তির সঙ্গে শারীরিক বা মানসিক অন্য কোন সমস্যা থাকলে একই সঙ্গে তারও চিকিৎসা করতে হয়।

আরো পড়ুনঃ ব্রেন ভালো রাখার উপায় কি

⇨ চিকিৎসার পাশাপাশি ভর্তির সময় গ্রুপসাইকো থেরাপি ও ফ্যামিলি থেরাপিও দেওয়া হয়। বাসায় যাওয়ার পরও কমপক্ষে ছয় মাস এই থেরাপি গুলো নিতে হয়। এতে তার আসক্তি কমে যায়।

⇨ ইউরিন পরীক্ষা করার মাধ্যমে আবারো জানা সম্ভব যে সে আবার ইয়াবা গ্রহণ করা শুরু করেছে কিনা।

প্রতিরোধে করণীয়

⇨ ইয়াবা খেলে যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়-এমন ভ্রান্ত ধারণা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা।

⇨ ইয়াবার অন্যান্য সাইড ইফেক্টগুলো জেনে সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা।

⇨নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা এবং মূল্যবোধের মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন শক্ত করা।

⇨ আবেগের প্রভাব মানুষকে নেশার দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই নিজের আবেগ দমনের ক্ষমতা বাড়ানো।

⇨ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন ঔষধ নয়। কেউ আসক্ত হলে দ্রুত চিকিৎসা করানো।

⇨ যাদের সংস্পর্শে এমন পরিণতি, তাদের পুরোপুরি এড়িয়ে চলা। প্রয়োজনে যোগাযোগ বন্ধ করতে ইয়াবা বিক্রেতা, ওইসব বন্ধু-বান্ধবের ফোন নাম্বার ডিলিট ও ব্লক করে দেওয়া। প্রয়োজনে নিজের নাম্বারও পরিবর্তন করা।

⇨ প্রয়োজনে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ।

⇨ বাসায় কখনো একা একা না থাকা।

⇨ মন ভালো হয়ে যায় এমন কোন কাজ করা, মুভি দেখা বা পরিবারের সাথে মাঝে মাঝে অন্য কোথাও ঘুরতে যাওয়া।

⇨ ইয়াবার কুফল সম্পর্কে সবাইকে জানিয়ে বিশেষত উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

শেষ কথা

ইয়াবা একটি মারাত্মক জীবননাশকারী নেশা। এটি পরিবার এবং সমাজ উভয়ের উপর প্রভাব ফেলে। তাই নেশা কারিকে নয় নেশাকে ঘৃণা করুন। যেহেতু এটি দিন দিন তরুণ তরুণীদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করছে। তাই সমাজের তরুণ তরুণীদেরকে বেশি বেশি সচেতন করতে হবে এবং এর কুফল সম্পর্কে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে। পরিশেষে আমাদের পরিবার সমাজ রাষ্ট্রকে মাদকমুক্ত একটি সুন্দর সুস্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে।

পোস্ট সম্পর্কিত কিছু ট্যাগঃ কি খেলে ইয়াবার নেশা কাটে, ইয়াবা খাওয়ার নিয়ম, ইয়াবার ক্ষতিকর দিক, ইয়াবা খেয়ে ঘুমানোর উপায়, ইয়া সেবনকারী চেনার উপায়, ইয়াবা রক্তে কতদিন থাকে, ইয়াবার নেশা কাটানোর উপায়, ইয়াবা খাওয়ার লক্ষণ।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url